মূল বিষয়ে যান
Sunni Islam নির্দেশনা, ইবাদতের টুলস ও বিশুদ্ধ উৎস

চতুর্থ স্তম্ভ

সাওম: রমজানের রোজা

সাওম হলো ইবাদতের নিয়তে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও স্বামী-স্ত্রীর মিলন থেকে বিরত থাকা। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের ও সক্ষম মুসলিমের ওপর রমজান মাসের রোজা ফরজ।

রমজানের দিন
২৯–৩০
দৈনিক রোজা
সুবহে সাদিক → সূর্যাস্ত
লাইলাতুল কদর তালাশের রাত
শেষ ১০
শাওয়ালের মুস্তাহাব রোজা
৬

ফরজ বিধান

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ كُتِبَ عَلَيْكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

হে মুমিনগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।
সূরা আল-বাকারা ২:১৮৩

নতুন চাঁদ দেখা গেলে অথবা শাবানের ত্রিশ দিন পূর্ণ হলে রমজান শুরু হয়। নবী ﷺ বলেছেন: “যে ঈমানসহ ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।” (সহিহ বুখারি ৩৮, সহিহ মুসলিম ৭৬০)

কার ওপর রোজা ফরজ — আর কারা অব্যাহতিপ্রাপ্ত

ব্যক্তিবিধানপরবর্তীতে
প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের, সুস্থ ও মুকিম মুসলিমরোজা রাখা ফরজ—
মুসাফির (প্রায় ৮০ কিলোমিটার বা তার বেশি সফর)রোজা ভাঙতে পারেনকাজা আদায় করবেন
সাময়িক অসুস্থরোজা রাখলে ক্ষতি হলে বা আরোগ্য বিলম্বিত হলে ভাঙতে পারেনকাজা আদায় করবেন
দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থ বা রোজা রাখতে অক্ষম বৃদ্ধঅব্যাহতিপ্রাপ্তপ্রতিদিনের জন্য ফিদইয়া দেবেন
হায়েজ বা নেফাসরোজা রাখবেন নাকাজা আদায় করবেন
গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী, ক্ষতির আশঙ্কায়রোজা ভাঙতে পারেনকাজা আদায় করবেন; শুধু সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা হলে কোনো কোনো মাযহাবে ফিদইয়াও দিতে হয়
অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুফরজ নয়ধীরে ধীরে অভ্যাস করানো হয়

রোজা রাখার নিয়ম

  1. ১

    নিয়ত

    অন্তরে রোজার নিয়ত করুন। রমজানের জন্য মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাযহাবে সুবহে সাদিকের আগে নিয়ত আবশ্যক; হানাফি মাযহাবে দ্বিপ্রহরের আগ পর্যন্ত নিয়ত করা যায়। মালেকি মতে পুরো মাসের জন্য একবার নিয়তই যথেষ্ট।

  2. ২

    সাহরি

    ফজরের কাছাকাছি সময় পর্যন্ত দেরি করে সাহরি খান। “তোমরা সাহরি খাও, কেননা সাহরিতে বরকত আছে।” (সহিহ বুখারি ১৯২৩)

  3. ৩

    সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বিরত থাকুন

    সুবহে সাদিক (ফজর) থেকে সূর্যাস্ত (মাগরিব) পর্যন্ত পানাহার, ধূমপান ও স্বামী-স্ত্রীর মিলন নয়।

  4. ৪

    জিহ্বা ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযত রাখুন

    মিথ্যা, গিবত, ঝগড়া এবং রোজার সওয়াব নষ্ট করে এমন সবকিছু থেকে বিরত থাকুন।

  5. ৫

    ইফতার

    ذَهَبَ ٱلظَّمَأُ وَٱبْتَلَّتِ ٱلْعُرُوقُ وَثَبَتَ ٱلْأَجْرُ إِنْ شَاءَ ٱللَّهُ

    Dhahaba adh-dhama'u wabtallatil-'uruqu wa thabatal-ajru in sha' Allah

    সূর্যাস্ত হলেই দ্রুত ইফতার করুন, উত্তম হলো তাজা খেজুর বা পানি দিয়ে (সুনান আবু দাউদ ২৩৫৭)।

রমজানের সময়সূচিআপনার শহরের সাহরি ও ইফতারের সময়

যেসব কারণে রোজা ভাঙে

কাজপ্রভাবকরণীয়
ইচ্ছাকৃত পানাহাররোজা ভেঙে যায়কাজা; হানাফি ও মালেকি মতে কাফফারাও
দিনের বেলা স্বামী-স্ত্রীর মিলনরোজা ভেঙে যায়কাজা ও কাফফারা (সর্বসম্মত)
ইচ্ছাকৃত বমিরোজা ভেঙে যায়কাজা
হায়েজ বা নেফাস শুরু হওয়ারোজা শেষ হয়ে যায়কাজা
ইচ্ছাকৃত ধূমপান বা ধোঁয়া টেনে নেওয়ারোজা ভেঙে যায়কাজা
পুষ্টিকর ইনজেকশন বা স্যালাইনরোজা ভেঙে যায়কাজা
ভুলে খাওয়ারোজা ভাঙে নারোজা চালিয়ে যান (মালেকি: কাজা করবেন)
অনিচ্ছাকৃত বমিরোজা ভাঙে না—
দাঁত ব্রাশ, মিসওয়াক, থুতু গেলারোজা ভাঙে নাটুথপেস্ট গিলবেন না
গোসল, সুগন্ধি, চোখের ড্রপ (অধিকাংশ মত)রোজা ভাঙে না—
কাফফারা

সহবাসের মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে রমজানের রোজা ভাঙলে (হানাফি ও মালেকি মতে ইচ্ছাকৃত পানাহারেও): একজন দাস মুক্ত করা, না পারলে একটানা ষাট দিন রোজা রাখা, তাও না পারলে ষাটজন মিসকিনকে খাওয়ানো।

কাজা, ফিদইয়া ও কাফফারা

কাজা

ছুটে যাওয়া প্রতিটি রোজার বদলে একটি রোজা রাখা, উত্তম হলো পরবর্তী রমজানের আগেই।

ফিদইয়া

স্থায়ীভাবে রোজা রাখতে অক্ষম ব্যক্তি প্রতিদিনের জন্য একজন মিসকিনকে খাওয়াবেন — প্রায় এক বেলার খাবার বা তার মূল্য (হানাফি: আধা সা' গম)।

কাফফারা

ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙা রমজানের রোজার জন্য একটানা ষাট দিন রোজা, অক্ষম হলে ষাটজন মিসকিনকে খাওয়ানো।

ফিদইয়া ও যাকাতুল ফিতর ক্যালকুলেটরকত দিতে হবে হিসাব করুন

রমজানকে সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগান

  • রাতে জামাতে বা ঘরে তারাবিহ পড়ুন
  • কুরআন তিলাওয়াত ও চিন্তা করুন — অনেকে অন্তত একবার খতম করেন
  • শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে, বিশেষত ২৭তম রাতে লাইলাতুল কদর তালাশ করুন
  • শেষ দশ দিনে ইতিকাফ (মসজিদে অবস্থান) করুন
  • উদারভাবে দান করুন ও রোজাদারকে ইফতার করান
  • ঈদের নামাজের আগে যাকাতুল ফিতর (ফিতরা) আদায় করুন

لَيْلَةُ ٱلْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ

কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।
সূরা আল-কদর ৯৭:৩
লাইলাতুল কদরের দোয়া

اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي — “হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, সুতরাং আমাকে ক্ষমা করুন।” (জামে তিরমিজি ৩৫১৩)

যাকাতুল ফিতর (ফিতরা)

ঈদের দিন যার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য থাকে, এমন প্রত্যেক মুসলিমের ওপর যাকাতুল ফিতর ওয়াজিব; পরিবারপ্রধান প্রত্যেক পোষ্যের পক্ষ থেকে তা আদায় করেন। এর পরিমাণ খেজুর, যব, কিশমিশ বা চালের মতো প্রধান খাদ্যের এক সা' (প্রায় ২.৫–৩ কেজি)। হানাফি মাযহাবে আধা সা' গম দেওয়া এবং তার মূল্য টাকায় পরিশোধ করা জায়েজ; গরিবের জন্য বেশি উপকারী হলে অন্যান্য মাযহাবের অনেক আলেমও টাকায় দেওয়া গ্রহণ করেন। ঈদের নামাজের আগেই দেওয়া উচিত, এক-দুই দিন আগেও দেওয়া যায়।

মুস্তাহাব ও নিষিদ্ধ রোজা

রোজাকখনবিধান
শাওয়ালের ছয় রোজাঈদুল ফিতরের পর যেকোনো ছয় দিনমুস্তাহাব — সারা বছর রোজা রাখার সমতুল্য (সহিহ মুসলিম ১১৬৪)
আরাফার দিন৯ জিলহজ, হাজি নন এমন ব্যক্তিদের জন্যমুস্তাহাব — দুই বছরের গুনাহের কাফফারা
আশুরা১০ মুহাররম, ৯ তারিখসহমুস্তাহাব — পূর্ববর্তী বছরের গুনাহের কাফফারা
সোমবার ও বৃহস্পতিবারসাপ্তাহিকমুস্তাহাব
আইয়ামে বিদপ্রতি হিজরি মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখমুস্তাহাব
দাউদ (আ.)-এর রোজাএকদিন পরপরসর্বোত্তম নফল রোজা
ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা১ শাওয়াল, ১০ জিলহজনিষিদ্ধ
আইয়ামে তাশরিক১১, ১২, ১৩ জিলহজনিষিদ্ধ (কিছু হাজি ব্যতীত)
হিজরি ক্যালেন্ডারএই দিনগুলো ক্যালেন্ডারে দেখুন

প্রশ্নোত্তর

সচরাচর জিজ্ঞাসা

রাত আছে ভেবে ফজরের পর খেয়ে ফেললে কী হবে?

অধিকাংশ আলেমের মতে সেদিনের রোজা কাজা করতে হবে, তবে দিনের বাকি সময় বিরত থাকবেন।

সাহরি না খেয়ে কি রোজা রাখা যায়?

হ্যাঁ, রোজা সহিহ হবে; সাহরি অনেক বরকতময় একটি সুন্নত।

রক্ত পরীক্ষা করলে কি রোজা ভাঙে?

অধিকাংশ আলেমের মতে অল্প রক্ত নিলে রোজা ভাঙে না। হাম্বলি মতে শিঙা লাগানো (হিজামা) রোজা ভেঙে দেয়।

যেসব স্থানে দিন খুব দীর্ঘ, সেখানে রোজা কখন শেষ হবে?

স্থানীয় সুবহে সাদিক ও সূর্যাস্ত অনুযায়ী রোজা রাখুন। যেখানে এগুলো স্বাভাবিকভাবে হয় না, সেখানে নিকটতম স্বাভাবিক দিনের শহর বা মক্কার সময় অনুসরণের পরামর্শ দেন আলেমগণ।