রেওয়ায়ত ১. আব্দুল্লাহ ইবন আবু বকর ইবন মুহাম্মদ ইবন আমর ইবন হাযম (রহঃ) তাহার পিতা হইতে বর্ণনা করেন যে, দিয়াতের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে পত্র তাহাকে লিখিয়াছিলেন উহাতে উল্লেখ ছিল, জীবনের দিয়াত বা বিনিময় এক শত উট। যখন পূর্ণ নাক কাটা যায় এবং স্থানটি সম্পূর্ণ সমান হইয়া যায় তখন উহার দিয়াত একশত উট। যখন মাথার পিছে পর্যন্ত পৌছিয়াছে উহাতে তিন ভাগের এক ভাগ দিয়াত, পেটের যখমেও দিয়াতের তিন ভাগের এক ভাগ। চক্ষুর দিয়াত পঞ্চাশ উট, হাত এবং পায়েরও পঞ্চাশ উট করিয়া দিয়াত রহিয়াছে। প্রতিটি অঙ্গুলির দিয়াত দশ উট। প্রতিটি দাঁতের দিয়াত পাঁচ উট। হাড় বাহির করিয়া দিয়াছে এমন যখমের দিয়াত পাঁচ উট।
রেওয়ায়ত ২. মালিক (রহঃ) বলেনঃ উমর (রাঃ) যখন ঐ সমস্ত গ্রাম্য লোকের উপর দিয়াতের মূল্য লাগাইতেন যাহাদের নিকট স্বর্ণ হইত তখন স্বর্ণওয়ালাদের উপর এক হাজার দীনার এবং রৌপ্যওয়ালাদের উপর বার হাজার দিরহাম নির্দিষ্ট করিয়া দিতেন। মালিক (রহঃ) বলেনঃ শাম ও মিসরের অধিবাসিগণ স্বর্ণওয়ালা, আর ইরাকের অধিবাসিগণ রৌপ্যওয়ালা। মালিক (রহঃ) পর্যন্ত খবর পৌছিয়াছে যে, লোকের নিকট হইতে তিন অথবা চারি বৎসরের মধ্যে দিয়াত উশুল করা হইবে। মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমার তিন বৎসরে দিয়াত উশুল করা পছন্দনীয়। মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের নিকট ইহা একটি সর্বসম্মত বিষয় যে, দিয়াতে স্বর্ণ-রৌপ্যওয়ালাদের নিকট হইতে উট লওয়া হইবে না। আর উটওয়ালাদোর নিকট হইতে সোনা চান্দি লওয়া হইবে না। আর স্বর্ণওয়ালাদের নিকট হইতে রৌপ্য এবং রৌপ্যওয়ালাদের নিকট হইতে স্বর্ণ লওয়া হইবে না।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ যখন ইচ্ছাকৃত হত্যার নিহত ব্যক্তির ওয়ারিসগণ দিয়াতের উপর সম্মত হইয়া যায় তখন দিয়াত পঁচিশটি বিনত মাখায, পচিশটি বিনত লবুন, পঁচিশটি হিক্কা ও পঁচিশটি জাযআ হইবে। বিনত মাখায, বিনুত লবুন, হিককা ও জাযআ ইহাদের সম্পর্কে যাকাত অধ্যায়ে বর্ণনা করা হইয়াছে।
রেওয়ায়ত ৩. ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ (রহঃ) হইতে বর্ণিত, মারওয়ান মু'আবিয়াকে লিখিলেন, আমার নিকট এক উন্মাদকে আনা হইয়াছে, সে এক ব্যক্তিকে হত্যা করিয়াছে। মু'আবিয়া উত্তরে লিখিলেনঃ তাহাকে বন্দী করিয়া রাখ, তাহা হইতে কিসাস লইও না। কেনা উন্মাদের কিসাস নাই। মালিক (রহঃ) বলেনঃ যদি কোন বলেগ ও নাবালেগ মিলিত হইয়া কাহাকেও ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করে, তবে বালেগ হইতে কিসাস লওয়া হইবে আর নাবালেগের উপর অর্ধদিয়াত ওয়াজিব হইবে । মালিক (রহঃ) বলেনঃ যদি কোন স্বাধীন ও দাস মিলিত হইয়া কোন দাসকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করে, তবে গোলামকে তো কিসাসে হত্যা করা হইবে, আর স্বাধীন ব্যক্তির উপর ঐ গোলামের অর্ধেক মূল্য ওয়াজিব হইবে।
রেওয়ায়ত ৪. ইরাক ইবন মালিক ও সুলায়মান ইবন ইয়াসার (রহঃ) হইতে বর্ণিত, বনি সাদের এক ব্যক্তি ঘোড়া দৌড়াইল যাহাতে জুহায়ন গোত্রের এক ব্যক্তির অঙ্গুলি নষ্ট করিয়া দিল; অঙ্গুলি হইতে এত রক্ত ঝরিল যে, তাহাতে ঐ ব্যক্তি মারা গেল। উমর (রাঃ) প্রথমে তো বনী সা’দকে বলিলেনঃ তুমি এই কথার উপর পঞ্চাশ বার কসম করিতে পার যে, এই ব্যক্তি অঙ্গুলি নষ্ট হওয়ার দরুন মরে নাই; তাহারা ইহাতে সম্মত হইল না। যখন তাহারা কসম করিল না তিনি জুহায়নী গোত্রের লোকদের বলিলেনঃ তোমরা কসম করিবে কি? তাহারাও ইহাতে সম্মত হইল না। অতঃপর তিনি বনী সা’দ হইতে অর্ধেক দিয়াত দেওয়াইয়া দিলেন। মালিক (রহঃ) বলেনঃ এই হাদীসের উপর আমল করা হইবে না। ইবন শিহাব, সুলায়মান ইবন ইয়াসার ও রবী’আ ইবন আবী আবদুর রহমান বলেনঃ ভুলবশত হত্যার দিয়াতে কুড়িটি বিনত মাখায, কুড়িটি বিনত লবুন, কুড়িটি ইবন কবুননের, কুড়িটি হক্কা এবং কুড়িটি জায’আ দেওয়া হইয়া থাকে। মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের নিকট ইহা একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত যে, নাবালেগদের হইতে কিসাস লওয়া হইবে না, যদিও সে স্বেচ্ছায় হত্যা করে। এই ধরনের হত্যা ভুলবশত হত্যার পর্যায়ে পড়িবে। বালেগ না হওয়া পর্যন্ত এই হুকুম অর্থাৎ তাহার উপর শাস্তি বর্তাইবে না তাহার বলেগ হওয়া পর্যন্ত। এইজন্যই যদি কোন অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে কাহাকেও হত্যা করে, তবে ইহা ভুলক্রমে হত্যা হইয়াছে মনে করিতে হইবে। যদি নাবালেগ ও বালেগ মিলিতভাবে কাহাকেও হত্যা করে, প্রত্যেকের জন্য অর্ধেক দিয়াত নির্ধারিত হইবে। মালিক (রহঃ) বলেন, যে ব্যক্তি ভুলক্রমে নিহত হয় তাহার দিয়াত তাহার ও তাহার মালের পরিমাণে হইবে, যাহা দ্বারা তাহার ফরয আদায় করা হইবে, তাহার ওসীয়ত আদায় করা হইবে যদি তাহার নিকট দিয়াতের সমান মাল থাকে আর দিয়াত ক্ষমা করিয়া দেওয়া হয় তবে তাহা বৈধ। যদি এত মাল না থাকে তবে ই -এর পরিমাণ ক্ষমা করিতে পারে। অবশিষ্ট যাহা থাকে উহা ওয়ারিসদের হক।
সাঈদ ইবন মুসায়্যাব (রহঃ) বলতেন, তিন ভাগের এক পর্যন্ত পুরুষ স্ত্রী উভয়ের দিয়াত সমান। যেমন দিয়াত সাব্যস্ত করার করার ব্যাপারে স্ত্রীলোকের অঙ্গুলি পুরুষের অঙ্গুলির মতো, স্ত্রীলোকের দাত পুরুষের দাতের মতো। স্ত্রীদের মাওযেহা (ঐ যখম যাহাতে হাড় দেখা যায়) পুরুষদের মাওযেহার মতো, অনুরূপভাবে স্ত্রীলোকের মুনকিলাহ (ঐ যখন যাহাতে হাড় স্থানচ্যুত হইয়া যায়) পুরুষের মুনকিলাহর মতো। ইবন শিহাব ও উরওয়া ইবন যুবাইর (রহঃ) স্ত্রীদের ব্যাপারে সাঈদ ইবন মুসায়্যাবের মতো বলতেন যে, স্ত্রীগণ তিন ভাগের একভাগ দিয়াত পর্যন্ত পুরুষদের মতো হইবে, অতঃপর পুরুষদের অর্ধ দিয়াতের সমপরিমাণ হইবে। ইবন শিহাব (রহঃ) বলিতেন, এই নিয়ম চলিয়া আসিয়াছে যে, যদি পুরুষ নিজের স্ত্রীকে আঘাত দ্বারা ক্ষতি করিয়া দেয়, তবে তাহা হইতে দিয়াত লওয়া হইবে, কিন্তু কিসাস হইবে না। মালিক (রহঃ) বলেন, এই ব্যবস্থা তখনই হইবে যখন পুরুষ ভুলে ক্ষত করে। যদি ইচ্ছাকৃতভাবে এইরূপ করে তবে কিসাস অনিবার্য দেয় হইবে। মালিক (রহঃ) বলেন, যে স্ত্রীলোকের স্বামী বা সন্তান তাহার সম্প্রদায়ের না হয় সেই স্ত্রীলোক স্ত্রীলোকদের অপরাধের দিয়াতে শরীক হইবে না। এইরূপে তাহার বাচ্চা ও বৈমাত্রেয় ভাই যখন ভিন্ন গোত্রের হইবে সেও দিয়াতে শরীক হইবে না। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সময় হইতে আজ পর্যন্ত সমগোত্রের উপরই দিয়াত হইয়া থাকে। কিন্তু মীরাসে সন্তান ও বৈমাত্রেয় ভাই মালিক হইবে। যেমন স্ত্রীলোকের মুক্ত দাসের মীরাস তাহার সন্তানকে দেওয়া হইবে যদিও তাহার গোত্রের না হয়। কিন্তু তাহাদের অপরাধের দিয়াত স্ত্রীর স্বগোত্রের উপর বর্তাইবে।
মুয়াত্তা ইমাম মালেক 1561Sahih
وَحَدَّثَنِي يَحْيَى، عَنْ مَالِكٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ أَبِي سَلَمَةَ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ امْرَأَتَيْنِ، مِنْ هُذَيْلٍ رَمَتْ إِحْدَاهُمَا الأُخْرَى فَطَرَحَتْ جَنِينَهَا فَقَضَى فِيهِ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِغُرَّةٍ عَبْدٍ أَوْ وَلِيدَةٍ .
রেওয়ায়ত ৫. আবু হুরায়রা (রাঃ) হইতে বর্ণিত, হুযাইলের দুই স্ত্রীলোক পরস্পর মারামারি করিতে যাইয়া একে অপরের প্রতি পাথর নিক্ষেপ করিল যাহাতে তাহার পেটের বাচ্চা বাহির হইয়া গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিয়াত একটি দাস বা একটা দাসী দেওয়াইলেন।
মুয়াত্তা ইমাম মালেক 1562Sahih
وَحَدَّثَنِي عَنْ مَالِكٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَضَى فِي الْجَنِينَ يُقْتَلُ فِي بَطْنِ أُمِّهِ بِغُرَّةٍ عَبْدٍ أَوْ وَلِيدَةٍ فَقَالَ الَّذِي قُضِيَ عَلَيْهِ كَيْفَ أَغْرَمُ مَا لاَ شَرِبَ وَلاَ أَكَلْ وَلاَ نَطَقَ وَلاَ اسْتَهَلّ وَمِثْلُ ذَلِكَ بَطَلْ . فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " إِنَّمَا هَذَا مِنْ إِخْوَانِ الْكُهَّانِ " .
রেওয়ায়ত ৬. সাঈদ ইবন মুসায়্যাব (রহঃ) হইতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গর্ভস্থ সন্তান হত্যার ব্যাপারে একটি দাস অথবা দাসী দিয়াত দেওয়ার আদেশ করিয়াছেন। যাহার উপর দিয়াতের আদেশ হইয়াছে সে বলিলঃ আমি এই সন্তানের রক্তপণ কিরূপে আদায় করিব, যে খায় নাই, পান করে নাই, কথা বলে নাই, না ক্ৰন্দন করিয়াছে। এইরূপ সন্তানের তো খুন মাফ করা হইয়া থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেনঃ লোকটি তো (কাহিন) যাদুকরের ভাই। রবী'আ ইবন আবী আবিদের রহমান বলিতেন, দাস বা দাসীর মূল্য যাহা গর্ভস্থ শিশুর জন্য দেওয়া হয় পঞ্চাশ দীনার অথবা ছয় শত দিরহাম হওয়া উচিত, আর স্বাধীন মুসলিমের স্ত্রীর দিয়াত পাঁচ শত দীনার বা ছয় হাজার দিরহাম। মালিক (রহঃ) বলেন, স্বাধীনা রমণীর গর্ভস্থ বাচ্চার দিয়াত স্ত্রীলোকের দিয়াতের দশমাংশ আর উহা পঞ্চাশ দীনার বা ছয় শত দিরহাম। গর্ভস্থ বাচ্চার দিয়াত ঐ সময় দেওয়া অনিবার্য হয় যখন বাচ্চা মরিয়া পেট হইতে বাহির হইয়া পড়ে। আমি ইহাতে কাহাকেও ইখতিলাফ করিতে দেখি নাই। যদি বাচ্চা পেট হইতে জীবিত বাহির হইয়া মারা যায় তবে পূর্ণ দিয়াত দিতে হইবে। মালিক (রহঃ) বলেন, গর্ভস্থ সন্তানের ক্ৰন্দন দ্বারা বুঝা যাইবে যে, সে জীবিত না মৃত। যদি ক্ৰন্দন করিয়া মরিয়া যায় তবে পূর্ণ দিয়াত দেওয়া অনিবার্য হইবে। দাসীর পেটের সন্তানের বেলায় দাসীর মূল্যের দশমাংশ দিয়াত দিতে হইবে। মালিক (রহঃ) বলেন, যদি গর্ভবতী স্ত্রী কোন পুরুষ অথবা স্ত্রীলোককে হত্যা করে, তবে তাহার সন্তান প্রসবের পূর্বে তাহার হইতে কিসাস লওয়া হইবে না। যদি গর্ভবতী স্ত্রীলোককে কেহ হত্যা করে, ইচ্ছাকৃতই হউক বা ভুলক্রমেই হউক, তাহার গর্ভস্থ সন্তানের দিয়াত অনিবার্য হইবে না, বরং যদি তাহাকে ইচ্ছাকৃত হত্যা করা হইয়া থাকে, তবে হত্যাকারীকে হত্যা করা হইবে আর যদি ভুলক্রমে হত্যা করা হইয়া থাকে, তবে দিয়াত দিতে হইবে। মালিক (রহঃ)-কে প্রশ্ন করা হইয়াছিল, যদি কেহ ইহুদী বা খৃস্টান স্ত্রীলোকের গর্ভস্থ বাচ্চাকে হত্যা করিয়া বাহির করিয়া দেয় উহার হুকুম কি? তিনি উত্তর দিলেন, তাহার মাতার দিয়াতের এক দশমাংশ অংশ দিতে হইবে।
সাঈদ ইবন মুসায়্যিব (রহঃ) হইতে বর্ণিত, তিনি বলিতেন, উভয় ঠোঁটে পূর্ণ দিয়াত রহিয়াছে। যদি নিচের ঠোঁট কাটিয়া ফেলা হইয়া থাকে তবে উহাতে এক-তৃতীয়াংশ দিয়াত দিতে হইবে। মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমি ইবন শিহাব যুহরীর নিকট জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, যদি কোন কানা চক্ষুবিশিষ্ট লোকের চক্ষু উপড়াইয়া ফেলে, তবে কি হুকুম? তিনি বলিলেন, যদি ইচ্ছাকৃত হয়, তবে তাহার চক্ষু উপড়াইয়া ফেলিতে পারে। আর যদি ইচ্ছায় না হয় তবে এক হাজার দীনার বা বার হাজার দিরহাম লইবে। মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমার নিকট রেওয়ায়ত পৌছিয়াছে যে, যে অঙ্গ শরীরে দুই দুইটি রহিয়াছে, যদি কেহ উভয়টি নষ্ট করিয়া দেয়, তবে পূর্ণ দিয়াত দিতে হইবে, আর জিহ্বাতে পূর্ণ দিয়াত হয়। যদি কানে এইরূপ চোট লাগে যাহাতে শ্রবণশক্তি বিলুপ্ত হইয়া যায় যদিও কান কাটা না যায় তবুও পূর্ণ দিয়াত দিতে হয়। এইরূপে লজ্জাস্থান ও অণ্ডকোষের পূর্ণ দিয়াত রহিয়াছে। মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমার নিকট রেওয়ায়ত পৌছিয়াছে যে, যদি কোন মহিলার স্তনদ্বয় কাটিয়া ফেলা হয়, তবে উহাতে হইবে পূর্ণ দিয়াত। আর যদি ভ্ৰ কামাইয়া ফেলে এবং পুরুষের উভয় স্তন কাটিয়া ফেলে, তবে পূর্ণ দিয়াত হইবে না। মালিক (রহঃ) বলেন, যদি কোন ব্যক্তির উভয় হাত, উভয় পা এবং উভয় চক্ষু নষ্ট করিয়া দেয়, তবে ভিন্ন ভিন্নভাবে পূর্ণ দিয়াত দিতে হইবে, পায়ের ভিন্ন, হাতের ভিন্ন এবং চক্ষুর ভিন্ন ভিন্ন দিয়াত দিতে হইবে অর্থাৎ তিন দিয়াত অথবা তিন হাজার দীনার বা ৩৬ হাজার দিরহাম দিতে হইবে। মালিক (রহঃ) বলেন, যদি কেহ এক চোখ কানা ব্যক্তির ভাল চক্ষু ভুলে নষ্ট করিয়া ফেলে, তবে পূর্ণ দিয়াত দিতে হইবে।
যায়দ ইবন সাবিত (রাঃ) বলিতেন, যদি চক্ষু ঠিক থাকে কিন্তু দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হইয়া যায় তবে এক শত দীনার দিয়াত দিতে হইবে। মালিক (রহঃ) বলেন, যদি কেহ কাহারও চক্ষুর উপরের চামড়া কাটিয়া ফেলে অথবা চক্ষুর চতুষ্পার্শ্বের গোল হাড় ভাঙ্গিয়া ফেলে তবে উহা চিন্তা করিয়া উপযুক্ত পরিমাণ দিয়াত দিতে হইবে। যদি দৃষ্টিশক্তি যাইতে থাকে তবে ক্ষতির পরিমাণ দিয়াত দিতে হইবে। মালিক (রহঃ) বলেন, যদি কেহ কাহারও ঐ চক্ষু নষ্ট করিয়া ফেলে যাহা বাহ্য দৃষ্টিতে ঠিক থাকিলেও উহাতে দৃষ্টিশক্তি ছিল না অথবা ঐরূপ একটি হাত কাটিয়া ফেলে যাহা কার্যক্ষম ছিল, তবে দিয়াত দেওয়া অনিবার্য হইবে না। হ্যাঁ, বিচারকের (মতো) বিচারে যাহা স্থির হয় সেইরূপ দিয়াত দিতে হইবে।
ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ (রহঃ) হইতে বর্ণিত, তিনি সুলায়মান ইবন ইয়াসার হইতে শ্রবণ করিয়াছেন, তিনি বলিতেন, চেহারার ক্ষত যাহাতে হাড় দেখা যায়, মাথার হাড় দেখা যাওয়া অবস্থায় যখমের মতো, কিন্তু তাহার জন্য যদি চেহারা দেখিতে বিকৃত হইয়া যায়, তবে দিয়াত বাড়াইয়া দেওয়া হইবে। মাথার অর্ধেক পর্যন্ত যে ক্ষত হইবে উহার জন্য ৭৫ দীনার দেওয়া জরুরী হয়। মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের মতে ইহা একটি সর্বসম্মত বিধান যে, মুনকালা হইলে ১৫ উট দিতে হইবে। মালিক (রহঃ) বলেন, মুনকালা ঐ ক্ষতকে বলে যাহাতে হাড় স্থানচ্যুত হইয়া যায়, আর এই আঘাত মাথার মগজ পর্যন্ত না পৌছে। এই আঘাত মাথা ও চেহারায় সীমিত থাকে। মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের নিকট এই বিধান সর্বসম্মত যে, মাসুমা ও জায়িকায় কিসাস নাই, যুহরীও এইরূপ বলিয়াছেন। মালিক (রহঃ) বলেন, মাসুমা ঐ ক্ষতকে বলা হয় যাহাতে হাড় ভাঙ্গিয়া মাথার মগজ পর্যন্ত পৌছে আর এই ক্ষম মাথায়ই হইয়া থাকে। অবশ্য এই আঘাতে হাড় ভাঙ্গিলেও উহা মগজের ক্ষতি করে না। মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের নিকট ইহা সর্বসম্মত বিধান যে, মুযিহা হইতে অল্প ক্ষতে দিয়াত নাই যতক্ষণ উহা মুযিহা পর্যন্ত না পৌছে। মুযিহা বা তদূর্ধ্ব ক্ষতে দিয়াত দিতে হইবে। কেননা আমর ইবন হাযমের হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেনঃ মুযেহায় পাঁচ উট; ইহার নিমের পরিমাণ বর্ণনা করেন নাই। আর কোন ইমামও বর্তমানে বা অতীতে মুযিহার নিম্ন পরিমাণ দিয়াতের আদেশ করেন নাই। মালিক (রহঃ) বলেন, ইবন শিহাব যুহরীরও মত ইহাই। মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমার নিকটও একটি ক্ষতের কোন পরিমাণ নির্দিষ্ট নাই, বরং ইহা বিচারকের বিচারের উপর নির্ভর করবে। মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের নিকট ইহা সর্বসম্মত বিধান যে, মাসুমা, মুনকালা ও মুযিহা শুধু মাথা ও চেহারায় হইয়া থাকে। যদি অন্য কোন স্থানে হয় তবে বিচারকের রায়ের উপর আমল করা হইবে। ইবন যুবাইর মুনাকালার কিসাস লইয়াছেন। মালিক (রহঃ) বলেন, নিচের চোয়াল ও নাক মাথায় ধরা হইবে না, বরং এই দুইটি পৃথক অঙ্গ। ইহাদের অতিরিক্ত মাথা আর একটি পৃথক হাড়।
রবীআ ইবন আবদির রহমান (রহঃ) সাঈদ ইবন মুসায়্যাব (রহঃ)-কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, মহিলাদের অঙ্গুলির দিয়াত কি? তিনি বলিলেন, দশটি উট। আমি আবার প্রশ্ন করিলামঃ দুই অঙ্গুলিতে? তিনি বলিলেনঃ কুড়িটি উট। আমি আবার বলিলাম, তিন অঙ্গুলিতে? তিনি বলিলেনঃ ত্রিশটি উট। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, চারিটি অঙ্গুলিতে? তিনি বলিলেনঃ কুড়িটি উট। আমি বলিলাম, যখন ক্ষত বর্ধিত হইল, কষ্ট বাড়িয়া গেল, তখন দিয়াত কমিয়া গেল? সাঈদ ইবন মুসায়্যিব (রহঃ) বলিলেনঃ তুমি ইরাকের অধিবাসী? আমি বলিলাম, না, আমি যতটুকু জানি উহাতে স্থির থাকি। আর যাহা জানি না উহা জিজ্ঞাসা করিয়া লই। সাঈদ বলিলেনঃ ভাতিজা, সুন্নত ইহাই। মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের নিকট ইহা একটি সর্বসম্মত বিধান যে, যখন পূর্ণ এক হাতের সমস্ত অঙ্গুলি কাটিয়া ফেলা হয়, তবে প্রতিটি অঙ্গুলি দশ উটের হিসাবে দিয়াত দিতে হহবে। তাহা হইলে পঞ্চাশ উট দিতে হইবে। যদি সমস্ত অঙ্গুলিই কাটা হয় তখনও ইহার দিয়াত পূর্ণ হাতের তথা ৫০ উট হইবে। যদি হাতসহ কাটা যায় তবে দীনারের হিসাবে তত দীনার হইবে।
রেওয়ায়ত ৭. উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-এর গোলাম আসলাম (রাঃ) হইতে বর্ণিত, উমর ইবনুল খাত্তাব একটি দাঁতে এক উট, হাঁসুলির হাড়ের জন্য এক উট এবং পাঁজরের জন্য এক দিয়াতের আদেশ করিয়াছেন। ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ (রহঃ) শুনিয়াছেন, সাঈদ ইবন মুসায়্যাব (রহঃ) বলিতেন, উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) প্রতি দাঁতে এক উটের আদেশ করিতেন। মুআবিয়া ইবন আবী সুফিয়ান (রাঃ) প্রতি দাতে পাঁচ উটের আদেশ করিতেন। উমর (রাঃ) কমাইয়া দিয়াছেন আর মুআবিয়া বাড়াইয়া দিয়াছেন। আমি হইলে প্রতি দাঁতে দুই দুই উট ধার্যকরিতাম যেন দিয়াত পূর্ণ হইয়া যায়। সাঈদ ইবন মুসায়্যাব (রহঃ) বলিতেন, যখন দাঁতে আঘাত লাগে আর উহা কাল হইয়া যায়, তবে পূর্ণ দিয়াত দিতে হইবে। যদি কাল হইয়া পড়িয়া যায় তবুও পূর্ণ দিয়াত দিতে হইবে।
রেওয়ায়ত ৮. আবু গাতফান ইবন তারীফ মুররী (রহঃ) হইতে বর্ণিত, মারওয়ান ইবন হাকাম তাঁহাকে আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট জিজ্ঞাসা করিতে পাঠাইলেন যে, অদরাস দাঁতের দিয়াত কি? আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাঃ) বললেন, পাঁচ উট। তিনি আবার জিজ্ঞাসা করিতে পাঠাইলেন যে, সম্মুখের দাঁত ও মাঢ়ীর দাঁতের দিয়াত কি সমান হইবে? ইবন আব্বাস বলিলেন, যদি তোমরা দাঁতের ব্যাপারে অঙ্গুলির সহিত সমঞ্জস করিয়া লইতে তবে ভাল ছিল। হিশাম ইবন উরওয়া (রহঃ) তাহার পিতা উরওয়া ইবন যুবাইর (রহঃ) হইতে বর্ণনা করেন, পূর্ব যুগে সমস্ত দাঁতের দিয়াত সমান ছিল, কোন দাঁতের বেশি কোন দাঁতের কম ছিল না। মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের নিকট মাঢ়ীর দাত, সম্মুখের বড় দাঁত ও পাশের ছোট দাঁত সমস্তই এক সমান। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি দাঁতে পাঁচ উট দিয়াতের আদেশ করিয়াছেন। মাঢ়ীর দাঁত বা অন্য কোন দাঁতেরই কোন দাঁতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব নাই।
সাঈদ ইবন মুসায়্যাব (রহঃ) ও সুলায়মান ইবন ইয়াসার (রহঃ) হইতে বর্ণিত, তাহারা উভয়ে বলিতেন, দাসের ক্ষতে তাহার মূল্যের বিশ ভাগের একভাগ অংশ হইবে। মালিক (রহঃ) বলেন, মারওয়ান ইবন হাকাম ঐ ব্যক্তিকে, যে কোন দাসকে ক্ষত করিয়া দিত, আদেশ করিতেন যে, এই ক্ষতের দরুন তাহার মূল্যের যতটুকু কম পড়িল তাহাকে উহা দিতে হইবে। মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদেন নিকট সিদ্ধান্ত এই যে, দাসের ক্ষতে তাহার মূল্যের বিশ ভাগের এক ভাগ আর যে ক্ষতের দরুন হাঁড় স্থানচ্যুত হয় উহাতে তাহার মূল্যের দশ ভাগের একভাগ ও বিশ ভাগের একভাগ আর মাসুমায়[1] ও জাইফার প্রতিটার জন্য তাহার মূল্যের ত্রিশ ভাগের একভাগ দিতে হইবে। উহা ব্যতীত প্রতি প্রকার ক্ষত করার জন্য তাহার মূল্যে ক্ষতের যে ক্ষতি হইবে তাহা আদায় করিতে হইবে। যখন দাস সুস্থ হইয়া যাইবে, তখন দেখিতে হইবে ক্ষতের পূর্বে কি মূল্য ছিল এবং ক্ষতের জন্য কত কম হইল, উহা দিতে হইবে। মালিক (রহঃ) বলেন, যদি কেহ দাসের হাত-পা ভাঙ্গিয়া ফেলে, পরে সে ভাল হইয়া যায়, তবে কোন ক্ষতিপূরণ দিতে হইবে না। হ্যাঁ, যদি কোন ক্রটি থাকিয়া যায় তবে ক্ষতিপূরণ দিতে হইবে। মালিক (রহঃ) বলেন, দাস ও দাসীর ব্যাপারে স্বাধীনদের মতো কিসাস দিতে হইবে। যদি দাস ইচ্ছাকৃতভাবে কোন দাসীকে হত্যা করে, তবে দাসকেও কিসাসে হত্যা করিতে হইবে। যদি ক্ষত করিয়া দেয় তদ্রুপ ক্ষত তাহারও করা হইবে। যদি এক দাস অন্য কোন দাসকে ইচ্ছাকৃতভাবে মারিয়া ফেলে, তবে নিহতের প্রভুর ইচ্ছার উপর নির্ভর করিবে, হয় হত্যাকারীকে হত্যা করিবে অথবা দিয়াত অর্থাৎ গোলামের মূল্য লইয়া লইবে। অনুরূপভাবে হত্যাকারীর প্রভুর ইচ্ছার উপর নির্ভর করিবে, হয় নিহত ব্যক্তির মূল্য আদায় করিবে এবং হত্যাকারীকে নিজের নিকট থাকিতে দিবে অথবা নিহতের প্রভু দিয়াতের উপর রায়ী হইয়া হত্যাকারীকে লইয়া লইবে, তাহা হইলে তাহাকে হত্যা করিবে না।মালিক (রহঃ) বলেন, যদি কোন মুসলিম দাস কোন ইহুদী অথবা খ্রিষ্টানকে যখম করিয়া ফেলে তবে দাসের প্রভু ইচ্ছা করিলে দিয়াত দিয়া দিবে বা ঐ দাস বিনিময়ে দিয়া দিবে এবং দাসকে বিক্রয় করিয়া তাহার ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করিবে। কিন্তু ঐ মুসলিম গোলামকে অমুসলিমের নিকট থাকিতে দেওয়া হইবে না।
মালিক (রহঃ) বলিয়াছেন, তাহার নিকট রেওয়ায়ত পৌছিয়াছে যে, উমর ইবন আবদুল আযীয (রহঃ) বলতেন, ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের দিয়াত যখন তাহারা একে অন্যকে হত্যা করে, স্বাধীন মুসলিমের দিয়াতের অর্ধেক । মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের নিকট বিধান এই যে, কোন মুসলিমকে কাফিরের পরিবর্তে হত্যা করা হইবে না। হ্যাঁ, যদি ধোঁকা দিয়া সে যিম্মীকে হত্যা করে তবে তাহাকে হত্যা করা হইবে। সুলায়মান ইবন ইয়াসার (রহঃ) বলিতেন, অগ্নিউপাসকদের দিয়াত আট শত দিরহাম। মালিক (রহঃ) বলেন, ইহাই আমাদের নিকট বিধান। মালিক (রহঃ) বলেন, ইহুদী ও খ্রিস্টানদের ক্ষত করার দিয়াত মুসলিমদের ক্ষত করার দিয়াতের হিসাবে মুযিহার বিশ ভাগের একভাগ এবং মাসুমা ও জাইকায় তিন ভাগের একভাগ। ইহার উপর অন্যগুলির অনুমান করা যায়।
মালিক (রহঃ) কয়েকজন বিশিষ্ট আলিম হইতে শ্রবণ করিয়াছেন, তাহারা বলিতেন, যদি মৃত্যুর মুহূর্তে নিহত ব্যক্তি হন্তাকে ক্ষমা করিয়া দেয়, তবে ইহা ইচ্ছাকৃত হত্যায় বৈধ হইবে। কেননা ওয়ারিসদের চেয়ে নিহত ব্যক্তির নিজের রক্তের উপর অধিক অধিকার রহিয়াছে। মালিক (রহঃ) বলেন, যদি কোন ব্যক্তি হত্যাকারীকে তাহার ইচ্ছাকৃত হত্যা ক্ষমা করিয়া দেয়, তবে হত্যাকারীর উপর দিয়াতের বোঝা থাকিবে না। হ্যাঁ, যদি কিসাস ক্ষমা করিয়া দিয়াত সাব্যস্ত করিয়া লয়, তবে তাহা ভিন্ন কথা। মালিক (রহঃ) বলেন, যদি কোন ব্যক্তিকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হয়, আর সাক্ষীদের দ্বারা হত্যা সাব্যস্তও হয় এবং নিহতের ছেলে ও কন্যা থাকে, ছেলেরা তো ক্ষমা করিয়া দেয়, কিন্তু কন্যাগণ ক্ষমা না করে, তবে কোন অসুবিধা থাকিবে না। খুন মাফ হইয়া যাইবে। কেননা ছেলেরা থাকিতে কন্যাগণ ধর্তব্য নহে।
রেওয়ায়ত ১০. আমর ইবন শুআয়েব (রহঃ) বনী মদলজের এক ব্যক্তি, যাহার নাম ছিল কাতাদা, নিজের ছেলেকে তলোয়ারে আঘাত করিল, যাহাতে ঐ ছেলের পায়ে আঘাত লাগিল। ক্ষতস্থান হইতে রক্ত বন্ধ না হইয়া ছেলেটি মারা গেল। সুরাকা ইবন জাশাম উমর (রাঃ)-এর নিকট আসিয়া ঘটনা বর্ণনা করিল। উমর (রাঃ) তাহাকে বলিলেন, আমার কাদীদের কূপের নিকট আসা পর্যন্ত ১শত ২০টি উট যোগাড় করিয়া রাখ। যখন তিনি তথায় আসিলেন ঐ উটের ৩০ হক্কা, ২০টি জাযআ, ৪০টি গর্ভবতী উটনী লইলেন এবং বলিলেনঃ নিহত ব্যক্তির ভাই কোথায়? সে বলিল, আমি উপস্থিত আছি। তিনি বলিলেন, তুমি এই উট লইয়া যাও। হত্যাকারী মীরাস পায় না। সাঈদ ইবন মুসায়্যাব (রহঃ) ও সুলায়মান ইবন ইয়াসার (রহঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা হইল, যদি কেহ হারাম মাসসমূহে কাহাকেও হত্যা করে তবে তাহার দিয়াতের ব্যাপারে কি কঠোরতা অবলম্বন করা হইবে? তিনি বলিলেন, না, বরং ঐ সকল মাস হারাম মাস হওয়ার দরুন দিয়াত বাড়াইয়া লওয়া হইবে। অতঃপর সাঈদের নিকট জিজ্ঞাসা করা হইল, যদি কেহ এই মাসে কাহাকেও ক্ষত করিয়া দেয়, তবু সেই হত্যার মতো উহার দিয়াতও বৃদ্ধি পাইবে? সাঈদ বললেনঃ হ্যাঁ। মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমার মনে হয় বাড়াইয়া দেওয়ারও উহাই উদ্দেশ্য যেমন মদলজীর দিয়াত উমর (রাঃ) করিয়াছেন যখন সে তাহার ছেলেকে মারিয়াছিল।
রেওয়ায়ত ১১. উরওয়া ইবন যুবাইর (রহঃ) হইতে বর্ণিত, এক আনসার ব্যক্তি ছিলেন। তাহার নাম ছিল উহায়হা ইবন জুলাহ। উহায়হার একজন চাচা ছিল। সে উহায়হা হইতে বয়সে ছোট ছিল। সে তাহার নানার বাড়িতে বাস করিত। উহায়হা তাহাকে ধরিয়া মারিয়া ফেলিল (হত্যা করিল)। তাহার মামারা বলিলঃ আমরা তাহাকে লালন-পালন করিয়াছি, যখন সে জওয়ান হইল তখন তাহার ভাতিজা আমাদের উপর বিজয়ী হইল এবং সে দিয়াত লইয়া ফেলিল। উরওয়া বলেনঃ এইজন্যই হত্যাকারী নিহত ব্যক্তির ওয়ারিস হয় না।[1]মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের নিকট ইহা একটি সর্বসম্মত বিধান যে, ইচ্ছাকৃত হত্যাকারী নিহত ব্যক্তির ওয়ারিস হয় না। দিয়াত হউক বা অন্য কোন মাল হউক, এমন কি সে কোন ওয়ারিসকে বঞ্চিতও করিতে পারে। ভুলবশত হত্যায়ও হত্যাকারীর দিয়াতের ওয়ারিস হয় না। আমার মতে অন্যান্য মালের ওয়ারিস হয়।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের নিকট সর্বসম্মত বিধান রহিয়াছে যে, যদি কোন ব্যক্তি কাহারও হাত অথবা পা কাটিয়া ফেলে, তবে তাহার উপর কিসাস ওয়াজিব হইবে, দিয়াত নহে। মালিক (রহঃ) বলেন, সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত কিসাস লওয়া হইবে না। এখন যদি ক্ষতকারীর যখমও ভাল হইয়া যাহাকে ক্ষত করা হইয়াছে তাহার মতো হইয়া যায় তবে ভালই, আর যদি যে ক্ষত করিয়াছে তাহার ক্ষত বাড়িয়া যায় আর এই ক্ষতের দরুন তাহার মৃত্যু ঘটে, তবে যাহাকে যখম করা হইয়াছে তাহার ক্ষতিপূরণ দিতে হইবে না। যদি ক্ষতকারীর ক্ষত একেবারে ভাল হইয়া যায় আর যাহাকে ক্ষত করা হইয়াছে তাহার হাত একেবারে বেকার হইয়া যায় বা উহাতে অন্য কোন ক্রটি থাকিয়া যায়, তবে ক্ষত যে করিয়াছে তাহার নিকট হইতে দ্বিতীয়বার কিসাস লওয়া হইবে না। হ্যাঁ, ক্ষতি অনুসারে দিয়াত লওয়া যাইতে পারে। মালিক (রহঃ) বলেনঃ যদি কেহ ইচ্ছাকৃতভাবে স্বীয় স্ত্রীর চক্ষু নষ্ট করিয়া দিল বা হাত ভাঙ্গিয়া দিল বা অঙ্গুলি কাটিয়া ফেলিল তবে তাহার নিকট হইতে কিসাস লওয়া হইবে। যদি তাহাকে সতর্ক করার জন্য রশি অথবা কোড়া দ্বারা প্রহার করা হয় এবং অনিচ্ছায় কোন স্থানে লাগিয়া ক্ষত কিংবা অন্য কোন ক্ষতি হইল তবে দিয়াত ওয়াজিব হইবে, কিসাস ওয়াজিব হইবে না।
রেওয়ায়ত ১৪. মুহাম্মাদ ইবন আবদির রহমান ইবন সা’দ ইবন যুরারাহ (রহঃ) হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, তাহার নিকট রেওয়ায়ত পৌছিয়াছে যে, উম্মুল মু’মিনীন হাফসা (রাঃ) এক দাসীকে হত্যা করাইয়াছিলেন, যে দাসী তাঁহার উপর যাদু করিয়াছিল। ইহার পূর্বে তিনি উহাকে মুদাব্বার করিয়াছিলেন। পরে তাহাকে হত্যা করাইলেন। মালিক (রহঃ) বলেন, যে যাদু জানে এবং জাদু করে তাহাকে হত্যা করাই উচিত।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের নিকট সর্বসম্মত মাসআলা এই যে, হত্যার কসমে স্ত্রীলোকদের নিকট হইতে কসম লওয়া হইবে না। যদি নিহত ব্যক্তির ওয়ারিস শুধু স্ত্রীলোকই হয়, তবে ইচ্ছাকৃত হত্যায় না তাহাদের কসম করার অধিকার থাকে, না ক্ষমা করার। মালিক (রহঃ) বলেনঃ এক ব্যক্তিকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হইল, তাহার উত্তরাধিকারী ওয়ারিসগণ বলিলঃ আমরা কসম করিয়া কিসাস লইব। তবে তাহাদের জন্য ইহা বৈধ হইবে। মালিক (রহঃ) বলেন, এমতাবস্থায় যদি নারিগণ ক্ষমা করিতে ইচ্ছা করে তবে তাহাদের এই ইচ্ছা করা বৃথা। মালিক (রহঃ) বলেন, এ ব্যাপারে আসাবা ও ওয়ারিসগণ স্ত্রীগণ অপেক্ষা অগ্রগণ্য। কেননা তাহারা অধিকারী হিসাবে নিহত ব্যক্তির অধিক নিকটবর্তী আর তাহারা কসম করিয়াছে। মালিক (রহঃ) বলেনঃ যদি আসাবা বা ওয়ারিসগণ কসম করার পর নিজেরাই ক্ষমা করিয়া দেয় আর নারিগণ ক্ষমা না করে, তবে নারিগণের কিসাস লওয়ার অধিকার থাকিবে। মালিক (রহঃ) বলেনঃ ইচ্ছাকৃত হত্যায় অন্তত দুইজন বাদী হইতে কসম লইতেই হইবে। তাহাদের হইতে পঞ্চাশ কসম লইয়া কিসাসের আদেশ দেওয়া হইবে। যরকানী বলেনঃ কিসাস যেরূপ দুইজন সাক্ষীর সাক্ষ্য ব্যতীত সাব্যস্ত হয় না, তদ্রুপ কসমের বেলায়ও দুই অথবা তদূর্ধ্ব বাদী যতক্ষণ পর্যন্ত পঞ্চাশ কসম না করিবে ততক্ষণ পর্যন্ত কিসাসের আদেশ দেওয়া হইবে না। মালিক (রহঃ) বলেনঃ যদি কয়েকজন লোক সম্মিলিতভাবে এক ব্যক্তিকে এইভাবে হত্যা করে যে, ঐ ব্যক্তি সকলের আঘাতে তৎক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করে, তাহা হইলে কিসাসে সকলকেই হত্যা করা হইবে। যদি কয়েকদিন পর মারা যায়, তবে কসম লইতে হইবে। আর কসমের দারুন তাহাদের মধ্য হইতে শুধু এক ব্যক্তিকে হত্যা করা হইবে। কেননা কসমের দ্বারা সর্বদা এক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয় অর্থাৎ এক ব্যক্তিকে তো হত্যা করা হইবে, অবশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রত্যেককে একশত বেত্ৰাঘাত করা হইবে।
মালিক (রহঃ)-এর নিকট রেওয়ায়ত পৌছিয়াছে যে, মারওয়ান ইবন হাকাম (রহঃ) মুয়াবিয়া ইবন আবি সুফয়ান (রাঃ)-এর নিকট লিখিলেন, এক ব্যক্তি মাতাল অবস্থায় কাহাকেও হত্যা করিল। মুয়াবিয়া (রাঃ) তাহাকে লিখিলেন, তুমিও তাহাকে হত্যা কর। মালিক (রহঃ) বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ الْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بِالْعَبْدِ এই আয়াতের আমি উক্ত তফসীর যাহা শুনিয়াছি তাহা এই, এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন, স্বাধীনের পরিবর্তে স্বাধীন ব্যক্তিকে, দাসের পরিবর্তে দাসকে, স্ত্রীলোকের পরিবর্তে স্ত্রীলোককে হত্যা কর। অতএব স্ত্রীদের মধ্যেও পুরুষদের মতো কিসাস লওয়া হইবে। কেননা আল্লাহ তা’আলা বলিয়াছেনঃ وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالأَنْفَ بِالأَنْفِ وَالأُذُنَ بِالأُذُنِ وَالسِّنَّ بِالسِّنِّ وَالْجُرُوحَ قِصَاصٌ অর্থাৎ প্রাণের পরিবর্তে প্রাণ, চক্ষুর পরিবর্তে চক্ষু, নাকের পরিবর্তে নাক, কানের পরিবর্তে কান, দাঁতের পরিবর্তে দাঁত, ক্ষতের পরিবর্তে ক্ষত। অতএব, পুরুষের পরিবর্তে স্ত্রী এবং স্ত্রীর পরিবর্তে পুরুষ হত্যা করা হইবে। এইরূপ যখন একে অন্যকে যখম করে তখনও কিসাস লওয়া হইবে। মালিক (রহঃ) বলেন, যদি কেহ কাহাকেও ধরিয়া ফেলে আর দ্বিতীয় ব্যক্তি আসিয়া তাহাকে হত্যা করে আর যদি সাব্যস্ত হয় যে, ঐ ব্যক্তিও তাহাকে হত্যা করার জন্য ধরিয়াছিল, তবে তাহার পরিবর্তে উভয়কে হত্যা করিতে হইবে। যদি ঐ ব্যক্তি তাহাকে মারিয়া ফেলার জন্য না ধরিয়া থাকে, বরং তাহার ইচ্ছা ছিল দ্বিতীয় ব্যক্তি যাহাকে সে ধরিয়াছে তাহাকে সাধারণভাবে প্রহার করিবে, তবে এই অবস্থায় এই ব্যক্তি হত্যার পরিবর্তে কঠিন শাস্তির উপযুক্ত হইবে। আর শাস্তির পর এক বৎসর বন্দী থাকিবে। আর হত্যাকারীকে হত্যা করা হইবে। মালিক (রহঃ) বলেন, এক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তিকে ইচ্ছা করিয়া হত্যা করিল অথবা তাহার চক্ষু নষ্ট করিয়া ফেলিল। এখন হত্যাকারী হইতে কিসাস লওয়ার পূর্বেই তাহাকে অন্য এক ব্যক্তি হত্যা করিয়া বসিল বা তাহার চক্ষু নষ্ট করিয়া দিল; এই অবস্থায় তাহার উপর দিয়াত বা কিসাস কিছুই বর্তিবে না। কেননা যাহাকে হত্যা করা হইয়াছিল তাহার হক ছিল হত্যাকারীর প্রাণে বা চক্ষুতে। এখন হত্যাকারী ব্যক্তিও নাই, তাহার চক্ষুও নাই। ইহার উপমা এইরূপ, যেমন যদি এক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তিকে ইচ্ছা করিয়া হত্যা করে আর হত্যাকারী নিজেই মরিয়া যায় এখন হত্যাকাণ্ডে মৃত ব্যক্তির ওয়ারিসদের কিছুই মিলিবে না। কেননা যখন হত্যাকারীই মরিয়া গেল এখন না কিসাস রহিল, না দিয়াত। মালিক (রহঃ) বলেন, যদি কোন দাস স্বেচ্ছায় স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করে সেই দাসকে হত্যা করা হইবে । যদি স্বাধীন ব্যক্তি কোন দাসকে স্বেচ্ছায় হত্যা করে তবে স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করা হইবে না।
মালিক (রহঃ) বলেন, অনিচ্ছাকৃত হত্যায়ও বাদীপক্ষই প্রথমত কসম করিবে। তাহারা নিজেদের দিয়াতের অংশ অনুপাতে কসম করিবে পঞ্চাশ কসম। যেমন মৃত ব্যক্তির এক ছেলে আর তিন কন্যা রহিয়াছে। এখানে ছেলের দুই অংশ আর তিন কন্যার তিন অংশ – মোট পাঁচ অংশ হইল। পঞ্চাশকে পাঁচ ভাগ করিলে প্রতি অংশে দশ কসম আসিল। যেহেতু ছেলে দুই অংশ পাইবে, অতএব তাহাকে বিশ কসম করিতে হইবে আর প্রত্যেক কন্যা করিবে দশ কসম। যদি কসমে ভগ্নাংশ আসিয়া পড়ে তাহা হইলে যাহার উপর ভগ্নাংশের অংশ বেশি পড়িবে তাহার অংশেই পূর্ণ কসম বর্তাইবে। যেমন মৃত ব্যক্তি মা ও পিতা রাখিয়া গেল। যেহেতু মা এক তৃতীয়াংশ অংশের মালিক, পঞ্চাশকে তিন ভাগ করিলে ১৬ ভাগ ও দুইতৃতীয়াংশ প্রতি অংশে আসে। যেহেতু দুইতৃতীয়াংশ ভগ্নাংশের বেশি অংশ, অতএব মার অংশে ১৭ কসম আসিবে আর অবশিষ্ট ৩৩ কসম পিতার অংশে পড়িবে। মালিক (রহঃ) বলেন, নিহত ব্যক্তির ওয়ারিস যদি শুধু নারীই হয় তাহা হইলে তাহারাই কসম করিয়া দিয়াত (রক্তপণ) গ্রহণ করিবে। আর যদি নিহত ব্যক্তির ওয়ারিস শুধু একজন পুরুষ হয় তবে সে একাই পঞ্চাশ কসম করিয়া দিয়াত গ্রহণ করিবে।
মূল পাঠ, অনুবাদ ও মান নির্ণয়: ওপেন-সোর্স Hadith API (fawazahmed0/hadith-api)। মান নির্ণয়গুলো উল্লিখিত মুহাদ্দিসদের।